কলাপাড়ায় মধ্যস্বত্তভোগী দালাল-জালিয়াতচক্রের দখল দৌরাত্ম চরমে

0
312

’৭০ সালের ভয়াল ঘুর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাস থেকে নিজেসহ গোটা পরিবার এবং সম্পদকে রক্ষা করেছেন। ২০০৭ সালের প্রকৃতির বুলডোজারখ্যাত সুপার সাইক্লোন সিডরকেও মোকাবেলা করে টিকেছিলেন। সন্তান-সন্তুতি নিয়ে প্রায় ৬০টি বছর অসংখ্য প্রাকৃতিক দূর্যোগ মোকাবেলা করে জীবন-সংসার টিকিয়ে রেখেছেন। কিন্তু এখন আর পারছেন না বয়োবৃদ্ধ ইউসুফ মীনা। জীবন সায়াহ্নের কাছে পৌছেছেন। ভূমিদস্যু, জাল-জালিয়াতচক্রসহ এই সিন্ডিকেট যেন এখন প্রকৃতির সব ধরনের দূর্যোগকে হার মানছে। এদের ভয়াল থাবায় বসতভিটেসহ ৫০ বছরের ভোগদখলীয় প্রায় তিন একর কৃষিজমি এখন আর রক্ষা করতে পারছেন না এই মানুষটি। টিয়াখালী ইউনিয়নের পুর্বরজপাড়া গ্রামের জমিতে জবরদখল করে দেয়াল দেয়া হয়েছে। থানা পুলিশে কয়েকবার দৌড়াদৌড়ি করেছেন। এ মানুষটির অভিযোগ ইসমাইল আকন নামের এক ব্যক্তিকে মালিকানা দেখিয়ে তার জমি ঢাকার প্রভাবশালী সরকারি দলীয় এক এমপির প্রতিষ্ঠানের কাছে বিক্রি দেখানো হয়েছে। এখন এই চক্রের ভয়াল ছোবল কোন কিছুতেই মোকাবেলা করতে পারছেন না ইউসুফ মিনা। দ্বারে-দ্বারে ঘুরছেন তিনি। এ ঘটনায় সংবাদ সম্মেলন করায় তাকে কলাপাড়া পৌরশহরে আটকে রাস্তায় ফেলে সন্ত্রাসী লেলিয়ে মারধর করানো হয়েছে। তার ভাষায়, ‘আগে ও, রাজমিস্ত্রির কাম করত। এহন আওয়ামী লীগের নেতা সাইজ্যা তার লগে এমন কাম করছে।’ ইউসুফ মীনার এ জমির দখল নিয়ে গল্পের মতো গ্রামটির একে অপরের কাছে বলে বেড়ায়। শোনা যায় প্রায় ৬৫ লাখ টাকার ভাগাভাগির ফিসফিসানির শব্দ।

একজন ইউসুফ মীনা নন। একই ইউনিয়নের বাদুরতলী হাজী ওয়াজেদ আলী সিকদার বাড়ি জামে মসজিদের মোতয়াল্লী মোঃ আঃ জব্বার সিকদার লিখিত অভিযোগে জানান, মসজিদের বিএস ২৭০৫ খতিয়ানের ২৭৩০ ও ২৭৩৬ নম্বর দাগের দুই একর ৩৬ শতক জমিতে জবর দখল করে একই এলাকার মোঃ মজিবর হাওলাদার, মান্নান হাওলাদার গং স্থাপনা তুলছে। তাদের কেনা জমির অবস্থান অন্য দাগ-খতিয়ানে। এমনকি এ নিয়ে আদালতের স্থিতাবস্থাও রয়েছে। ১৯ জানুয়ারি থেকে দখল করে ওই চক্রটি এমন কাজ করছে। সর্বশেষ কলাপাড়া থানার ওসি মোঃ আলাউদ্দিনের হস্তক্ষেপে এখন কাজ বন্ধ রয়েছে। কিন্তু একটি ঘর তোলা শেষ করেছে। এমনসব অসংখ্য ঘটনায় এখন মধ্যবিত্ত, নিম্নমধ্যবিত্ত থেকে সাধারণ কৃষকপরিবারের হাজারো মানুষ রয়েছে মাথা গোঁজার ঠাঁই এক চিলতে জমি। কৃষিজমির ওপর যেন নজড় পড়ছে পাকিস্তানি হায়েনাদের মতো। একটি প্রভাবশালী মধ্যস্বত্তভোগী মাস্তানচক্র গড়ে ওঠেছে। এরা আবার জমির জাল দলিল বানিয়ে জমিতে সন্ত্রাসীচক্র পাঠায়। তারপরে আপোস-রফায় যায়। বাধ্য করানো হয় প্রতিপক্ষ বানিয়ে সালিশ-বৈঠকে বসানোর। এরপরে দর হাঁকানো হয় ফয়সালার মোটা অঙ্কের। এমন শত শত ঘটনায় এখন অসহায় কিংবা নিরীহ ভূমির মালিকরা তার জমিতে যে কোন সময় দখল হয়ে যাওয়ার শঙ্কায় বিনিদ্র রাত কাটাচ্ছেন।

স্থানীয় আওয়ামী লীগের দ্বিতীয়-তৃতীয় সারির একটি শ্রেণির থেকে এনিয়ে একটি চক্র গড়ে ওঠেছে। এরা শুধুমাত্র জমিজমার জালিয়াতি, কথিত মালিকানা সৃষ্টির মধ্য দিয়ে ফয়সালা কিংবা সালিশ বাণিজ্যের মাধ্যমে কোটিপতি বনে যওয়ার দৌড়বাণিজ্য চলছে। যা আওয়ামী লীগের অধ্যুষিত এই জনপদের ভোটব্যাংকে বড় ধরনের নেতিবাচক প্রভাব পড়ে গেছে। এ চক্রের দৌরাত্মে এখন এমন কোন গ্রাম নেই যেখানে আতঙ্ক ছড়ায়নি। লালুয়ার চান্দুপাড়া গ্রামের অসংখ্য কৃষক জানান, টিয়াখালীর আলমসহ স্থানীয় কয়েক মাস্তান সেখানে গিয়ে গরিব জনগোষ্ঠী জমির মালিকদের তাদের ধার্য্য করা দামে জমি বিক্রি করে দখল ছেড়ে দেয়ার হুমকি দিয়েছে। এমনকি কিছু জমি কিনে এমনভাবে পানি উন্নয়ন বোর্ডের বেড়িবাঁধের স্লোপসহ কাটাতারের বেড়া দেয়া হয়েছে যেখানে বাঁধের স্লোপের সাতটি ছিন্নমূল ভূমিহীন পরিবারকে তান্ডব চালিয়ে উচ্ছেদ করা হয়েছে। তাঁদের প্রশ্ন পানি উন্নয়ন বোর্ডের বাঁধের স্লোপে তারা থাকছেন। তাঁদেরকে সরকার কিংবা জমির মালিক পানি উন্নয়ন বোর্ড কোন উচ্ছেদ করছে না। অথচ প্রভাবশালী ওই সিন্ডিকেট ঝড়োহাওয়ার দশ নম্বর মহাবিপদ সঙ্কেতের মতো উচ্ছেদ সতর্ক জারির আদেশ করে উচ্ছেদ করে দেয়। নিজের বন্দোবস্ত পাওয়া জমি বিক্রিতে রাজি না হওয়ায় দুই দফা মারধর করা হয়েছে বয়োবৃদ্ধ মান্নাফ বয়াতীকে দুই দফা মারধর করা হয়েছে। মান্নাফ বয়াত এখন বাড়িঘর ছেড়ে পালিয়ে বেড়াচ্ছেন। এখন চান্দুপাড়ার ওই লোকজন আছেন মহা বিপদে। এক্ষেত্রে কলাপাড়া উপজেলা নির্বাহী অফিসার মোঃ তানভীর রহমান হস্তক্ষেপ করায় আপাতত কৃষকরা কিছুটা স্বস্তিতে রয়েছে। কিন্তু আতঙ্ক কাটেনি।

আলীপুর মৎস্যবন্দরের ব্যবসায়ী মোঃ হানিফ খান জানান, তাকে এক প্রভাবশালী শিল্পপতি জমি কেনার নাম করে কিছু টাকা দিয়ে দুইটি স্ট্যাম্পে সই নিয়ে এখন টাকাও দিচ্ছে না। উল্টো দলিল করে দেয়ার জন্য হত্যাসহ বিভিন্ন ধরনের হুমকি দিয়ে আসছে। তিনি এ ঘটনায় মহিপুর থানায় জিডি করতে গেলে তারা অপরাগতা প্রকাশ করেন। এই ব্যবসায়ী এখন আছেন চরম নিরাপত্তহীন। মোটকথা একটি মধ্যস্বত্তভোগীচক্র গোটা কলাপাড়ায় জমিজমা সংক্রান্ত জালিয়াতি, দখলসন্ত্রাস, সালিশ বাণিজ্য, সরকারি অধিগ্রহণের জমির ক্ষতিপুরন নির্ধারন, বাড়িঘর-গাছপালার ক্ষতিপুরন নির্ধারন প্রক্রিয়া নিয়ন্ত্রণের মধ্য দিয়ে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে। আর নিম্নবিত্ত মধ্য নিম্নবিত্ত শ্রেণির ভূমির মালিকদের মধ্যে উচ্ছেদ আতঙ্ক ছড়িয়ে দিচ্ছে। এচক্রের এক হোতাকে বুধবার রাতে লালুয়ার বানাতিবাজার থেকে লোকজন পাকড়াও করে পুলিশে দেয়। কিন্তু রাতেই আবার ইউপি চেয়ারম্যানে জিম্মায় ছাড়া পেয়ে যায়। এই নির্দিষ্ট চক্রের কারণে আওয়ামী লীগ সমর্থন অধ্যুষিত জনপদে দলটির জনপ্রিয়তায় ব্যাপক ক্ষতির কবলে পড়েছে। অথচ সরকার প্রধান শেখ হাসিনা এই উপজেলাকে ঘিরে দেশের উন্নয়নের একাধিক মেগা প্রকল্প বাস্তবায়ন করে চলেছেন। যেখানে সরকার প্রধানের নির্দেশনা রয়েছে কোন পরিবার কিংবা জমির মালিক যেন কোনভাবে হয়রাণি কিংবা প্রতারণার শিকার না হয়। কাউকে উচ্ছেদের আগে পুনর্বাসন করতে হবে। কিন্তু চিহ্নিত মধ্যস্বত্তভোগীচক্রের কারণে সরকারের সকল অর্জন ভেস্তে যাওয়ার উপক্রম হয়েছে। একাধিক গোয়েন্দা সংস্থা এই মধ্যস্বত্তভোগীচক্রকে চিহ্নিত করতে কাজ করছে বলে জানা গেছে। কিন্তু লালুয়াসহ সবকয়টি ইউনিয়নের ভূমিদস্যুচক্রকে শণাক্ত করে তাদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ না করলে আতঙ্কিত মানুষ আস্থা হারিয়ে ফেলছে। এই চক্রকে এখনই দমাতে না পারলে আগামি সংসদ নির্বাচনে এর একটি ব্যাপক নেতিবাচক প্রভাব পড়বে বলে খোদ আওয়ামী লীগের তৃণমূল পর্যায়ের ত্যাগী নেতাকর্মীদের সরাসরি মন্তব্য।

 

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here